২২ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা

Oct 4, 2026 - 12:17
 0  2
২২ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা

দেশের ব্যাংক খাতে গত জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ৭৮৯ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা হলেও নিট লোকসান হয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। একই সময়ে ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। মূলত পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা হলেও প্রভিশন ও অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর এসব ব্যাংক নিট লোকসানে পড়েছে।

রোববার অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-৩ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক) খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। একই সঙ্গে পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, লোকসানে থাকা ২২টি ব্যাংকের মধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক, ১৫টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং একটি বিদেশি ব্যাংক রয়েছে।

লোকসানি ব্যাংকগুলো হলো—জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, বাংলাদেশ কৃষি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি, বাংলাদেশ কমার্স, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, আইএফআইসি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, মেঘনা, ন্যাশনাল, গ্লোবাল ইসলামী, পদ্মা, সীমান্ত, সোশ্যাল ইসলামী, প্রিমিয়ার, ইউনিয়ন এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ খেলাপি ঋণ, প্রভিশন সংরক্ষণ ও মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোর আয় কমে যাচ্ছে। ফলে পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা হলেও প্রভিশন, অন্যান্য ব্যয় ও ঋণের সম্ভাব্য ক্ষতি হিসাব করার পর অনেক ব্যাংকই নিট লোকসানে পড়ছে।

১২ ব্যাংকে জরুরি তারল্য সহায়তা

১২টি দুর্বল ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে সংসদীয় কমিটিকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংককে ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সবচেয়ে বেশি ১৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক। এরপর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংককে ৫ হাজার ৪২১ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংককে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়েছে।

এর বাইরে এবি ব্যাংককে ৪ হাজার ২৭০ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে ৩ হাজার ৩ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংককে ৬১৪ কোটি টাকা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে ২৫২ কোটি টাকা এবং পদ্মা ব্যাংককে ২৫২ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬(৪)(ডি) এবং ১৭(১)(বি) ধারা অনুযায়ী, ৯০ দিন মেয়াদে এই অর্থ দেওয়া হয়। ব্যাংকিং পরিভাষায় একে ‘ওভারনাইট-ওডি’ সুবিধা বলা হয়। এই ধারের বিপরীতে ব্যাংকটি সমমূল্যের ‘ডিমান্ড প্রমিসরি নোট’ জমা দিয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, কোনো কারণে ব্যাংকটি অবসায়িত বা দেউলিয়া হলে সম্পদ বিক্রি করে সবার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পাওনা পরিশোধ করতে হবে।

ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা

কয়েকটি ব্যাংক তারল্য সংকটে থাকলেও সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট নেই। গত আগস্ট শেষে ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণের (সিআরআর) প্রয়োজন ছিল ৬৯ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। এ সময় ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করেছে ৮৯ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের (এসএলআর) বিপরীতে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করেছে ৭ লাখ ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। এসএলআর সংরক্ষণের পরও ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। এসব তারল্যের সিংহভাগ সরকারি সিকিউরিটিজ—ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে লিকুইড মানির কোনো ঘাটতি নেই; বরং উদ্বৃত্ত রয়েছে।

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আরও বেড়েছে। গত জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। গত মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা বা ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ কমানো সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার কমাতে ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে—এমন ব্যাংকগুলোর সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের সঙ্গে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আলোচনা করা হয়। শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কর্মপরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এছাড়া খেলাপি ঋণ কমাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

মূলধন সংকটে ব্যাংক

দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে গত মার্চ শেষে ৪০টি ব্যাংক ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। বিপরীতে, ১৫টি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক। গত মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলধনের এই দুর্বলতা ব্যাংকগুলোর লোকসান শোষণক্ষমতা, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং নতুন ঋণ সম্প্রসারণের সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষত যেসব ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক বা ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধনের নিচে রয়েছে, সেসব ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠন ও পুনঃমূলধনীকরণের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।

কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও অংশ নেন কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, সফিকুর রহমান কিরন, সাইফুল আলম, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এবং আবুল হাসনাত (হাসনাত আব্দুল্লাহ)।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াতের এমপি সাইফুল আলম। তিনি জানান, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য দলের পক্ষ থেকে তারা একটি প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের সংখ্যা কমাইতে হবে। এতটুকু দেশে এত ব্যাংক আমাদের দরকার নেই, প্রায় ৬৩টা ব্যাংক আছে।’

তিনি বলেন, কোনো ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, অতিরিক্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া চেয়ারম্যান বা পরিচালনা পরিষদ অপসারণ করতে পারবে না।

সাইফুল আলম আরও বলেন, দেশে যে অডিট হয়, তা আসলে কোনো কাজে আসছে না। ফরেনসিক অডিট করতে হবে। আমার আসলে এনপিএল কত, আমানত কত, পুঁজি কত—এটা ফরেনসিক অডিট না করলে বোঝা যাবে না।

বৈঠকে হাসনাত আব্দুল্লাহ অর্থঋণ আদালত ও উচ্চ আদালতে আটকে থাকা ৭৪ হাজার ৬৭৯টি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ নেওয়া এবং প্রয়োজনে পৃথক বেঞ্চ গঠনের দাবি জানান।

তিনি বলেন, খেলাপি ঋণে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মূল ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত নতুন ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতি নির্ধারণের জন্য তিনি অর্থমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
admin আপনার আশেপাশের তথ্য, সংবাদ, সমস্যা, সম্ভবনা, প্রতিভা, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, ব্যবসা, বানিজ্য প্রতিটি তথ্যের বিন্দু বিসর্গ তুলে ধরতে চাই। এই চেষ্টায় আপনাদের সাথে চাই, পাশে চাই, সহযোগীতা, পরামর্শ তথ্য চাই। md.sumon71khobor@gmail.com