হুথিরা কি লোহিত সাগর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে

Sep 12, 2026 - 01:12
 0  1
হুথিরা কি লোহিত সাগর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে

ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল দখলে নেওয়ার দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। তাদের অগ্রযাত্রা এখন পৌঁছে গেছে কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির মুখ পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার বন্দরনগরী মোকা দখল করে তারা সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

হুথিদের এই সাফল্যকে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবর্তনগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে। কারণ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি তেল পরিবহনে বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরপথের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে।

হুথিরা এরই মধ্যে সৌদি পতাকাবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে। এখন ইয়েমেনের পুরো উপকূল এবং বাব আল-মান্দেবের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত হলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, হুথিরা কি সত্যিই লোহিত সাগর বন্ধ করে দিতে পারবে?

ইয়েমেনে আবার কেন যুদ্ধ

ইয়েমেনে যুদ্ধ চলছে ২০১৪ সাল থেকে। ওই বছর হুথি যোদ্ধারা রাজধানী সানা ও বন্দরনগরী হুদাইদাহ দখল করে নেয়। সরকারকে সরে যেতে হয়।

ইরানের সমর্থন নিয়ে এরপর হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় সামরিক জোট। জোটটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পক্ষে লড়ছে। সরকারের প্রধান ঘাঁটি এডেনে।

ইরানের প্রভাব ঠেকানো এবং ইয়েমেন সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যেই ২০১৫ সালে সরাসরি যুদ্ধে নামে সৌদি আরব।

২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়। বড় ধরনের লড়াই থামলেও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ চলেছে। গত সপ্তাহে আবার তীব্র লড়াই শুরু হয়। কয়েক বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় সংঘর্ষগুলোর একটি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এবার হুথিদের লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগরের উপকূল। তারা দ্রুত অগ্রসর হয়ে একের পর এক এলাকা দখল করে। ইয়েমেন সরকারের বাহিনী পাল্টা হামলা চালালেও তা হুথিদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি।

কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব

বাব আল-মান্দেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এটি সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

প্রতিদিন বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে যায়।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বছরে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ পরিবহন করা হতো। ফেব্রুয়ারিতে ইরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার পর বাব আল-মান্দেবের ওপর জাহাজ চলাচলের চাপ আরো বেড়েছে।

ফলে ইয়েমেনের উপকূল দখল করে বাব আল-মান্দেবের কাছে পৌঁছে যাওয়া হুথিদের জন্য শুধু সামরিক সাফল্য নয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের ওপর চাপ তৈরির সুযোগও।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সৌদি তেলে

হুথিদের হাতে বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে গেলে সৌদি আরব সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব তার ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়িয়েছে। ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন আবকাইক তেলক্ষেত্র থেকে আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে গেছে।

এর সুবিধা হলো, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল লোহিত সাগর দিয়ে বিশ্ববাজারে পাঠানো যায়।

হরমুজে কোনো ধরনের বিঘ্নের কথা মাথায় রেখেই ১৯৮০-এর দশকে পাইপলাইনটি তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে হুথিদের ড্রোন হামলার সময়ও এটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।

চলমান যুদ্ধের পর সৌদি আরব পাইপলাইনটির সক্ষমতা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়েছে। এখন প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল লোহিত সাগর উপকূলে পাঠানো সম্ভব। যুদ্ধের আগে সক্ষমতা ছিল ৫০ লাখ ব্যারেল।

ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন ২১ শতাংশ বেড়েছে।

এখন হুথিদের হাতে পুরো ইয়েমেন উপকূল চলে যাওয়ায় সেই বিকল্প পথও ঝুঁকিতে পড়েছে।

হুথিরা এরই মধ্যে লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করেছে। শুক্রবার ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে ধোঁয়া ওঠার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। তবে পাইপলাইনটি হামলার শিকার হয়েছে কি না, সৌদি কর্তৃপক্ষ তা নিশ্চিত করেনি।

ইরান কতটা লাভবান হবে

হুথিদের এই অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে ইরান।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে নতুন একটি বড় ফ্রন্ট খুলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অচলাবস্থায় তেহরানের হাতে আরো একটি চাপের অস্ত্র তুলে দিচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি করছে। কিন্তু জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় পর্যবেক্ষকদের মতে, সেখানে ইরানই এখন সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

এর সঙ্গে বাব আল-মান্দেবের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ যুক্ত হলে ইরানের প্রভাব আরো বাড়বে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আলাম সালেহের ভাষায়, এতে ইরানের হাতে হরমুজের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর প্রভাব চলে আসবে।

এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রেও চাপ বাড়বে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়েছে। এতে যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ভোটারদের ক্ষোভ দেখা দিতে পারে। ট্রাম্পও চলতি সপ্তাহে বলেছেন, ওই নির্বাচনের আগে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আলাম সালেহের মতে, ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে নত করতে চাইছে ওয়াশিংটন। কিন্তু পরিস্থিতি নিজেদের পক্ষে ঘোরানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

হুথিদের অগ্রযাত্রা চীন ও রাশিয়ার কাছেও একটি বার্তা দিচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রভাব আগের তুলনায় কমছে।

হুথিরা কি নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে

হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রার অর্থ এই নয় যে তারা দীর্ঘদিন বাব আল-মান্দেব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।

ইয়েমেন সরকারের বাহিনীতে আনুমানিক ৩ লাখ সদস্য রয়েছে। হুথিদের সদস্যসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার।

তবু সরকারি বাহিনী নিজেদের মধ্যে বিভক্ত। সৌদি আরবের চাপও রয়েছে। ফলে সামরিক ফ্রন্ট খণ্ডিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে দ্রুতগতির ও কৌশলী হুথি বাহিনী।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, প্রায় এক দশক আগে সৌদি বাহিনী যে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়েছিল, বর্তমান হুথি বাহিনী তার চেয়ে অনেক বেশি উন্নত।

গত কয়েক বছরে ইরান থেকে পাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হুথিদের সামরিক সক্ষমতা আরো বাড়িয়েছে।

তবে কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, হুথিদের বড় দুর্বলতা শাসন পরিচালনায়। দ্রুত সামরিক সাফল্য পেলেও দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ধরে রাখা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

তার মতে, হুথিদের অগ্রযাত্রা শুধু তাদের শক্তির কারণে হয়নি। বরং সৌদি-সমর্থিত জোটের সক্ষমতাকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করা হয়েছিল।

তবে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। হুথিদের পুরো বাব আল-মান্দেব বা পুরো লোহিত সাগর নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন নাও হতে পারে।

আলাম সালেহের মতে, নৌপথটি ঝুঁকিপূর্ণ—এমন সামান্য আশঙ্কাই যথেষ্ট। এতে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানিগুলো ওই পথ এড়িয়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ, নৌপথ পুরোপুরি বন্ধ না করেও হুথিরা সেটিকে কার্যত অচল করে দিতে পারে।

সৌদি আরবের সামনে এখন কী পথ

এখন বড় প্রশ্ন, সৌদি আরব নিজেদের বিমান শক্তি ব্যবহার করে হুথিদের থামাতে পারবে কি না।

গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি বাহিনী হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো লক্ষ্য করে অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর মধ্যে মোকাও রয়েছে। তবে এসব হামলা এখন পর্যন্ত হুথিদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও আপাতত সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সংঘাত আরো বাড়াতে চায় না সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।

ওয়াশিংটনের সরাসরি সামরিক সহায়তার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুবার ফোন করেন। হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলার অনুরোধ জানান তিনি। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।

ফলে বাব আল-মান্দেবকে ঘিরে হুথিদের অগ্রযাত্রা এখন শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি, লোহিত সাগরের নৌপথ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের শক্তির ভারসাম্য।

হুথিরা লোহিত সাগর পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন এখন—এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারবে তারা।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
admin আপনার আশেপাশের তথ্য, সংবাদ, সমস্যা, সম্ভবনা, প্রতিভা, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, ব্যবসা, বানিজ্য প্রতিটি তথ্যের বিন্দু বিসর্গ তুলে ধরতে চাই। এই চেষ্টায় আপনাদের সাথে চাই, পাশে চাই, সহযোগীতা, পরামর্শ তথ্য চাই। md.sumon71khobor@gmail.com