বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল : তৃণমূলের রাজনীতি থেকে সর্বোচ্চ পদে

Aug 13, 2026 - 23:15
 0  0
বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল : তৃণমূলের রাজনীতি থেকে সর্বোচ্চ পদে

ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতির হাতেখড়ি। সেই পাঠ চুকিয়ে বনে যান কলেজ-শিক্ষক। কিন্তু রাজনীতির টান ভুলতে পারেননি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একপর্যায়ে সব ছেড়ে আবারো নাম লেখান রাজনীতির খাতায়। চলতে শুরু করেন গণমানুষকে সাথে নিয়ে। সেই থেকে রাজনীতি ও রাজপথ হয়ে ওঠে তার জীবনের নতুন পাঠশালা। শুরু করেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঠাকুরগাঁওয়ের তৃণমূল থেকে। ঠাকুরগাঁওয়ের পৌরসভার মেয়র পদে নির্বাচিত হয়ে মূল ধারার রাজনীতিতে জায়গা করে নেন তিনি।

এরপর একে একে এমপি, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, মহাসচিব থেকে এখন প্রেসিডেন্ট হওয়া আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। এই পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও প্রার্থী আছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটের কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। কিন্তু জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিএনপির এমপি এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিজ দলের বাইরে ভোট দেয়ার সুযোগ না থাকায় বাংলাদেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট হয়ে মির্জা ফখরুলের জন্য বঙ্গভবনে যাওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা।
Islam
 
এদিকে প্রেসিডেন্ট পদে দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শীর্ষ নেতাদের ডেকে নেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যসহ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিববৃন্দ, চিফ হুইপ এবং হুইপরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের শুরুতেই প্রেসিডেন্ট পদে চূড়ান্ত দলীয় প্রার্থী হিসেবে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণা করেন। এ সময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ অন্য শীর্ষ নেতারা টেবিল চাপড়িয়ে এবং করতালির মাধ্যমে তাকে শুভেচ্ছা জানান। পরে দলের মনোনয়নপত্র মির্জা ফখরুলের হাতে তুলে দিয়ে ফটোসেশন করেন প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যরা।

বিএনপি চেয়ারম্যান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে আনন্দের সাথে জানাচ্ছি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি মহাসচিব (পদত্যাগ করেছেন) মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিছুক্ষণ আগে দলে সম্মানিত চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।

রিজভী বলেন, মির্জা ফখরুল প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার সাথে সাথে বিএনপির মহাসচিব পদ এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য থেকে পদত্যাগ করেছেন। মহাসচিবের শূন্য পদে কে আসছেন: প্রশ্ন করা হলে রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমাদের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তার কাছে দায়িত্ব দেয়া আছে, তিনি যেটি যে প্রক্রিয়ায় যেভাবে করা দরকার, সেটি মতামত নিয়ে জানাবেন। সেটি আপনারা পরে জানতে পারবেন। এখন শুধু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করার কথা আমরা জানালাম।

ইসিতে মনোনয়নপত্র জমা
এদিকে দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি এবং ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদের পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা পড়েছে। ‘ঘোষণা ও বিবৃতিসহ’ মনোনীত প্রার্থীর স্বাক্ষর, প্রস্তাবক ও সমর্থকের নাম, ঠিকানা, স্বাক্ষর-সম্বলিত মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থীই প্রেসিডেন্ট হবেন, বাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতা। গতকাল বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে এসব মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-২০২৬ এর ‘নির্বাচনী কর্তা’ এ এম এম নাসির উদ্দিন।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দু’জন প্রার্থী তিনটি মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা অর্থাৎ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে বিএনপির পক্ষে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। অপরদিকে, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেয় ১১-দলীয় জোট। আগামী ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পরে বৈধতার বিষয় জানানো হবে।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আমাদের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হচ্ছেন দু’জন। আগামী ১৬ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে এই মনোনয়নপত্রগুলো যথাযথ আছে কি-না যাচাই-বাছাই করব। এই যাচাই-বাছাইয়ে আমাদের সহযোগিতা করার জন্য জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে একজন কর্মকর্তা আসবেন, ওনাদের স্বাক্ষরগুলো ভেরিফিকেশন করার জন্য। ১৬ আগস্ট আমি মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের পরে বৈধতার বিষয়টি তখন জানিয়ে দেবো।

বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে একটি জমা দেয়া হয়েছে। মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবকারীর নাম দেয়া আছে নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান এবং সমর্থক হয়েছেন ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

মনোনয়ন জমা দেয়ার পর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘বৈঠকে’ প্রেসিডেন্ট পদে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণায় জামায়াতের সমালোচনার জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আজকে কোনো বৈঠক ছিল না। যেহেতু তিনি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান, ওনাকে আমরা দায়িত্ব দিয়েছিলাম, উনি আমাদের ডেকে সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। সেখানে কোনো বৈঠক হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণভোটের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। গণভোট পুরোপুরি মানাও যাবে, না মানাও যাবে। কিন্তু আমরা মানব। সেই গণভোটটা আমরা পর্যায়ক্রমে সংসদে প্রতিফলিত করব। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন একটি আলাদা বিষয়। এটি নিয়ম রক্ষার কথাটি সঠিক না। হয়তো আপনারা বলতে পারেন, তারা পরাজিত হবে জেনেও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু তারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান না করে অংশগ্রহণ করছে, এটি গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি তাদের অভিন্দন জানাই। বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী কে হচ্ছেন: এমন প্রশ্নের জবাবে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, এর জন্য অপেক্ষা করেন, পরে শুনবেন।

বিএনপি প্রার্থীর বিষয়ে সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি বলেন, আমাদের দল ও জোট থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনীত করা হয়েছে। তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আগামী ২০ তারিখে (আগস্ট) নির্বাচিত করতে চাই।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, এটা স্থায়ী কমিটির বৈঠক ছিল না। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা আগেই দলীয় চেয়ারম্যানকে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করতে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

এ সময় বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী, হাবিব উন নবী খান সোহেল, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, রকিবুল ইসলাম বকুল, মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান প্রমুখ।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
২২তম প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। সংবিধান অনুযায়ী নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। প্রেসিডেন্ট পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনে ভোট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন ৬ আগস্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২৬-এর তফসিল ঘোষণা করেন। তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিল ছিল গতকাল ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা। মনোনয়নপত্র পরীক্ষা ১৬ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বাছাই পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট বিকাল ৪টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ করা হবে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত (জাতীয় সংসদের সংসদ কক্ষ)।

মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন :
তৃণমূলের রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে উঠে আসা মির্জা ফখরুল ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পেশাগত জীবন শুরু হয় শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র, বিএনপির তৃণমূলের নেতা, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, শেষ পর্যন্ত মহাসচিব: বহু ধাপ পেরিয়ে তিনি আজ দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির জন্য দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে এই পর্যন্ত আসতে এবং বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে উত্তীর্ণ করতে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে মির্জা ফখরুলকে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায়। তার বাবা মরহুম মির্জা রুহুল আমিন (চখা মিয়া) ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। পারিবারিকভাবেই রাজনীতির পরিবেশে বেড়ে উঠলেও মির্জা ফখরুলের নিজস্ব রাজনৈতিক পথচলার শুরু ছাত্রজীবন থেকে। সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন জীবনীতে তার ছাত্রজীবনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। থাকতেন সলিমুল্লাহ মুসলিম (এস এম) হলে। ঢাবি থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। ষাটের দশকের শেষভাগের ছাত্র আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা আরো দৃশ্যমান হয়।

শিক্ষাজীবন শেষে মির্জা ফখরুল শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৯৭২ সালে তিনি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। যদিও প্রথম পোস্টিং ছিল খুলনা বিএল কলেজে। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে তিনি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরেও কাজ করেন। তার কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে দায়িত্ব পালন। ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮২ সালে এস এ বারী পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন মির্জা ফখরুল। পরে তিনি আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান।

সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে :
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে সক্রিয় রাজনীতিতে নামেন মির্জা ফখরুল। দুই বছর পর ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সরকারি জীবনীতে তাকে ওই নির্বাচনে নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে তার দীর্ঘ উত্থান। দলের তৃণমূল থেকে ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি। জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহ-সভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। এরপর বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে একসময় দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন।

সংসদে প্রবেশ, মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব : মির্জা ফখরুল ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী হিসেবে। ওই সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করলে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বগুড়া-৬ আসনে তিনি নির্বাচিত হলেও দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। যা রাজনীতির ইতিহাসে বিরল ঘটনা। অতঃপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথ না নেয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।

বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে : বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে মির্জা ফখরুলের উত্থান ঘটে ধাপে ধাপে। ২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়। প্রায় পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তিনি বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে দলের শীর্ষ সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতা এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমানের দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থানের সময় দেশে থেকে দলীয় কর্মকা- পরিচালনায় মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিরোধী দলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার সময় তাকে একাধিকবার গ্রেফতার ও কারাবরণ করতে হয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার নয়াপল্টনের সংঘর্ষের পর তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো কারগারেই কেটেছে তার।
আন্দোলনের মাঠে দৃশ্যমান নেতৃত্ব : বিএনপির দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলনে মির্জা ফখরুল ছিলেন দলটির সবচেয়ে দৃশ্যমান নেতাদের একজন। দলীয় চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে দেশে থেকে সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, জোটের সঙ্গে আলোচনা এবং আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণায় তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান দলটির প্রধান রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির আন্দোলন, মামলা, গ্রেফতার ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেও তিনি দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের এই দীর্ঘ সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো: কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতিতে নিজেকে মাঠের নেতা হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। একই সঙ্গে বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনীতির বাইরে ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই মেয়ে: মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
admin আপনার আশেপাশের তথ্য, সংবাদ, সমস্যা, সম্ভবনা, প্রতিভা, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, ব্যবসা, বানিজ্য প্রতিটি তথ্যের বিন্দু বিসর্গ তুলে ধরতে চাই। এই চেষ্টায় আপনাদের সাথে চাই, পাশে চাই, সহযোগীতা, পরামর্শ তথ্য চাই। md.sumon71khobor@gmail.com