কী ঘটেনি এই ম্যাচে? ফুটবল থ্রিলার

Jul 8, 2026 - 06:33
 0  3
কী ঘটেনি এই ম্যাচে? ফুটবল থ্রিলার

কী ঘটেনি এই ম্যাচে?

ফুটবল কখনো কখনো নব্বই মিনিটের খেলা নয়। কখনো তা হয়ে ওঠে উপন্যাস। কখনো যুদ্ধ। কখনো অলৌকিকতার সাক্ষ্য। অপ্রতিরোধ্য সাহসের গল্প। মিয়ামির ফুটবলের রাতটি ছিল ঠিক তেমনই।

মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা সোবেইর প্রায় আশি মিনিট ধরে আটকে রেখেছিলেন পৃথিবীর সেরা ফুটবলারকে। একটি পেনাল্টি ফিরেছে গ্লাভসে। একটি অনিন্দ্যসুন্দর গোল হারিয়ে গেছে ভিএআরের পর্দায়। দুই গোলে এগিয়ে থাকা এক দল ছুঁয়ে ফেলেছিল ইতিহাস। প্রায় অলৌকিক স্বপ্নকে বাস্তবতার জমিনে নামিয়ে এনেছিল মিসর। তারপর দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র আট মিনিটে সবকিছু বদলে গেল। বদলে গেল ম্যাচের চিত্র। বদলে গেল ভাগ্য। বদলে গেল স্কোর। বদলে গেল জয়ী দলের নাম। এবং বদলে গেল গল্পের নায়কও।

আর্জেন্টিনা ৩, মিসর ২। শেষ পর্যন্ত এই স্কোরলাইনে শেষ হওয়া এই ম্যাচ নিয়ে যখনই আলোচনা হবে, তখনই প্রশ্নটা উঠবে—কী ঘটেনি এই ম্যাচে?

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক ক্লাসিক আছে। অনেক প্রত্যাবর্তন আছে। অনেক ট্র্যাজেডিও আছে। কিন্তু এক ম্যাচে এত নাটক, এত সৌন্দর্য, এত নিষ্ঠুরতা, এত বীরত্ব, এত নায়ক, এত পার্শ্বনায়ক—সব একসঙ্গে খুব কমই দেখা গেছে। এই রাত তাই শুধু একটি ম্যাচ নয়; এটি ফুটবলের নিজস্ব নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হওয়া এক মহাকাব্য।

যে ফুটবল থ্রিলারের প্রথম অধ্যায় বা অর্ধের নাম—মিসর। আর কিছুই নয়!

বিশ্বকাপে যে দলটি কখনোই সেরা ষোলোর বাধা টপকাতে পারেনি, সেই তারাই স্বপ্ন তৈরি করেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার। তাও আবার অন্য কাউকে নয়, একেবারে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে! ১৫ মিনিটে মারওয়ান আত্তিয়ার কর্নারটি ছিল যেন মরুভূমির বুক চিরে ওঠা এক ধুলিঝড়। সেই ঝড়ের চূড়ায় ভেসে উঠলেন ইয়াসের ইব্রাহিম। তার হেড ছুঁয়ে বল যখন আর্জেন্টিনার জালে আশ্রয় নিল, গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ তখন কেবল তাকিয়ে থাকা এক নীরব সাক্ষী। গো..ও…ল! ধারাভাষ্যকারের গলার চিৎকারও যে থামছিলই না!

মিসরের এই গোলে বিশ্বাস জন্মাল—অসম্ভবও মানুষ ছুঁতে পারে। তারপর এল সেই দৃশ্য, যা হয়তো বছরের পর বছর বিশ্বকাপের স্মৃতিচারণে ফিরে আসবে। পেনাল্টি পেল আর্জেন্টিনা। বলস্পটে রাখলেন লিওনেল মেসি। স্টেডিয়ামের শব্দ যেন থেমে গেল। কোটি কোটি মানুষের চোখে তখন একটাই দৃশ্য—বল জালে যাবে।

কিন্তু গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন মিসরের আরেক স্বপ্নবাজ। মোস্তফা সোবেইর।

মেসির শট কোনদিকে আসছে, তা পারফেক্ট অনুমান করলেন। দিলেন নিখুঁত সময়ে ঝাঁপ। ঠেকিয়ে দিলেন পেনাল্টি। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হলো মিসরের উল্লাস। সেই মুহূর্তে তিনি শুধু একটি পেনাল্টি ঠেকাননি; ঠেকিয়েছিলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আত্মবিশ্বাসের প্রথম ঢেউও।

এরপর ম্যাচে তার পরিচয় নেহাত আর গোলরক্ষক হয়ে রইল না। তিনি হয়ে উঠলেন প্রাচীর। মিসরের পিরামিডের দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড ফিরিয়ে দিলেন। আলভারেজের নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দিলেন হাতের পাঞ্জায়। আরেকটি শট ঠেলে দিলেন পোস্টের বাইরে। আর্জেন্টিনা যতবার আক্রমণ করেছে, ততবারই মনে হয়েছে মিসরের গোলপোস্টে গোলকিপার না, দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য দুর্গ।

১-০ গোলের লিড নিয়ে মিসর প্রথমার্ধ শেষ করল। এই ম্যাচ এখনো অনেক বাকি। সেই গল্পও প্রায় সংক্ষিপ্ত করে দিল মিসর দ্বিতীয়ার্ধে। দারুণ দক্ষতার এক গোলে। একই রকম দুটো গোল হলো। প্রথমটা রেফারি ভিডিও দেখে বাতিল করার পর ঠিক একই কায়দায় মিসর একই স্টাইলে আরেকটি গোল করল। এ যেন বাতিল হওয়া গোলের পুরো রিপ্লে! ২-০ গোলে মিসরের স্বপ্নটা আরও বড় হলো।

মোস্তফা জিকোর অনবদ্য ফিনিশিংয়ে বল জালে গেল। গ্যালারি উল্লাসে কেঁপে উঠল। কিন্তু ভিএআরের পর্দা সেই আনন্দ কেড়ে নিল। রেফারি বাঁশি বাজিয়ে সেই গোল বাতিল করে দিলেন। জানালেন, গোলের বিল্ডআপের সময় মিসর ফাউল করেছিল। একটি গোল হারিয়ে গেল ইতিহাসের অন্ধকারে। সঙ্গে সঙ্গে যেন বিতর্কের আগুন ছড়িয়ে পড়ল মাঠজুড়ে।

কিন্তু মিসর থামেনি। সাহসের লড়াইয়ে জেতার শপথ নিল। ৬৭ মিনিটে আবারও তারা ফিরল। সালাহর পাস। হাসানের দৌড়। জিকোর ঠান্ডা মাথায় ফিনিশিং। এবার আর কোনো বাঁশি নয়। কোনো আপত্তি নয়। স্কোরলাইন জানাচ্ছে আর্জেন্টিনা ০, মিসর ২। ঘড়ি জানাল, ম্যাচের সময় তখন ৬৭ মিনিট চলছে।

সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মুকুট বুঝি আজ মরুভূমির বালুতেই চাপা পড়বে।

কিন্তু কিংবদন্তিরা পতনের গল্প লিখতে জানেন না। তারা ফিরে আসার গল্প লিখতে জানেন। আর আর্জেন্টিনা বাকি সময়ে যা করল, সেটা ফুটবল ম্যাচে কামব্যাক বা প্রত্যাবর্তনের অসম্ভব সুন্দর গল্প হয়ে রইল।

৭৯ মিনিটে মেসির পায়ের মাপা বল থেকে রোমেরোর হেড। একটা গোল শোধ। চার মিনিট পর দ্বিতীয় বিস্ফোরণ। এবার গোলের নায়ক মেসি নিজেই। বক্সের ভেতরে ভেসে আসা বলটিকে এমন এক ভলিতে জালে পাঠালেন মেসি, যেন তিনি নিজের সব ব্যর্থতার জবাব এক স্পর্শেই লিখে দিলেন। যে মানুষটি কিছুক্ষণ আগেও পেনাল্টি মিস করেছিলেন, সেই তিনিই আবার আশার প্রদীপ জ্বালালেন।

এই গোলের সঙ্গে যোগ হলো আরেকটি ইতিহাস। টানা নবম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল। এই বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই জালের দেখা। সময় যত এগোচ্ছে, পরিসংখ্যানগুলোও যেন মেসির পাশে দাঁড়িয়ে কিংবদন্তির আরেকটি স্তম্ভ গড়ে তুলছে। ম্যাচের স্কোরলাইন তখন ২-২। ভাবছেন গল্পের সমাপ্তি এখানেই। আরে নাহ্, নাটকের শেষ দৃশ্য যে তখনও বাকি। খেলা চলছে তখন ইনজুরি টাইমের। পাল্টা আক্রমণে উঠে পাওয়া বল থেকে লাউতারোর দীর্ঘ পাস। পেনাল্টি বক্সের সামনে এনজো নিখুঁত লাফ দিলেন। পারফেক্ট হেড। বল জালে। পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে যেন বিস্ফোরণ ঘটল। এই গোলেই আর্জেন্টিনার জয় এবং কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত।

আসুন এবার হিসেব মেলাই।

মাত্র আট মিনিটে তিন গোল। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও জয়। অসম্ভবকে হার মানিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা। তবু এই রাত শুধু বিজয়ীদের নয়। এই রাত মোস্তফা সোবেইরেরও। মিসরের এই গোলরক্ষক প্রায় আশি মিনিট ধরে পৃথিবীর সেরা আক্রমণভাগকে বন্দি করে রেখেছিলেন। এই রাত মিসরেরও। যারা ম্যাচ হেরেছে, কিন্তু ফুটবলকে আরও সুন্দর করেছে।

আর সন্দেহাতীতভাবে এই রাত লিওনেল মেসিরও। কিংবদন্তিরা কখনো ভুল করেন না—এমন নয়। তাদের ভুল জানিয়ে দেয় তারাও মানুষ। তবে তারা ভুলের ভেতর থেকেও এমনভাবে ফিরে আসেন, যাতে শেষ পর্যন্ত মানুষ ভুলটাকে নয়, প্রত্যাবর্তনটাকেই মনে রাখে। এই ম্যাচে মেসিকে মানুষ সেভাবেই মনে রাখবে। পেনাল্টি মিস করেছেন। আবার গোল করেছেন। গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। ম্যাচ শেষে তার চোখে আবেগের কান্না জানিয়ে দিল, ফুটবল শুধু নেহাত নব্বই মিনিটের খেলা নয়। এটি জীবনদর্শনও বটে!

কিছু ম্যাচ শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়। কিছু ম্যাচ ট্রফির ইতিহাসে বেঁচে থাকে। আর কিছু ম্যাচ সময়ের বুকেই নিজের ঠিকানা লিখে দেয়। মিয়ামির এই রাত ছিল অমনকিছুরই।

এই ফুটবল ম্যাচ আমাদের আরেকবার জানাল, এই খেলার সবচেয়ে বড় জাদুকর বল নয়, অনিশ্চয়তা! আর তাই ফুটবল এত সুন্দর!

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
admin আপনার আশেপাশের তথ্য, সংবাদ, সমস্যা, সম্ভবনা, প্রতিভা, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, ব্যবসা, বানিজ্য প্রতিটি তথ্যের বিন্দু বিসর্গ তুলে ধরতে চাই। এই চেষ্টায় আপনাদের সাথে চাই, পাশে চাই, সহযোগীতা, পরামর্শ তথ্য চাই। md.sumon71khobor@gmail.com