কলকাতায় পানির লাইন কেটে দেওয়ায় নদীর পানি খাচ্ছেন মুসলমানরা, ভোট না দেওয়ার শাস্তি!

Aug 28, 2026 - 09:10
 0  2
কলকাতায় পানির লাইন কেটে দেওয়ায় নদীর পানি খাচ্ছেন মুসলমানরা, ভোট না দেওয়ার শাস্তি!

ভোট না দেওয়ার ‘শাস্তি’ হিসেবে এক মাস ধরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে পানীয় জল৷ খাস কলকাতার বুকে এমনই এক অমানবিক পরিস্থিতির শিকার উত্তর কলকাতার কাশীপুরের জ্যোতিনগর কলোনির প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাসিন্দা। অভিযোগের তির স্থানীয় বিজেপি বিধায়কের দিকে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে এই গরিব মানুষদের এখন নিত্যদিনের ভরসা দূষিত গঙ্গার জল অথবা গাঁটের কড়ি খরচ করে কেনা পুরসভার জলের ট্যাঙ্ক।

কলকাতা পুরনিগমের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত এই কলোনিতে গত ২৭ থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত জলের পাইপলাইন মেরামতির কাজ করেছিল কেএমসি। ২৯ তারিখ পর্যন্ত জল এলেও, ওই দিন রাত সাড়ে ১১টা থেকে হঠাৎই কলোনির পাঁচটি রাস্তার কলের জল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকী, সাময়িকভাবে রাস্তার আলোও নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আলো ফিরলেও শুক্রবার পর্যন্ত কলের জল ফেরেনি।

স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর বিশ্বাসের অভিযোগ, দিনের পর দিন পুরনিগমে যোগাযোগ করেও কোনও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বাসিন্দাদের আক্ষেপ, একই রাস্তার ধারে থাকা হিন্দু-প্রধান কলোনিগুলোতে নিয়মিত জল আসছে, বঞ্চিত শুধু তাঁরাই। গঙ্গাই এখন একমাত্র ভরসা৷

জলের অভাবে এলাকার মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা জাহানারা বিবি বলেন, ‘ছোট ছোট বাচ্চারা মুখ ধুতে গিয়ে ঘাটে পিছলে গঙ্গায় পড়ে যাচ্ছে। অনেকেই অল্পের জন্য ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। সাঁতার না জানা মানুষগুলোও বাধ্য হয়ে নদীতে নামছেন।’ নদীর দূষিত জল ব্যবহারে শিশুদের জ্বর, মাথাব্যথা ও ত্বকের নানা রোগ দেখা দিচ্ছে বলে জানান সেখ মইনউদ্দিন। ঘাটের পিছল কাদায় পড়ে আহত হচ্ছেন বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষেরা। জলের অভাবে ইসমা খাতুন নামে এক স্কুলছাত্রীর পড়াশোনা ও স্কুলে যাওয়া বন্ধ। ঠিক পরীক্ষার মুখেই এই সংকট তার পড়াশোনায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। বস্তির স্কুলেও জলের কোনও সংযোগ নেই৷ এলাকার মসজিদে জলের অভাবে মানুষজন নমাজের আগে ওজু পর্যন্ত করতে পারছেন না।

প্রায় ছয় দশক ধরে এই কলোনিতে ৫০০টি পরিবারের বাস। নির্মাণকর্মী বা বোতল গলানোর কারখানায় নামমাত্র মজুরিতে কাজ করা এই মানুষগুলোর অধিকাংশই মুসলিম, তবে বেশ কিছু হিন্দু পরিবারও আছেন। স্থানীয়ভাবে এটি ‘মোল্লা পাড়া’ বা ‘মুসলিম কলোনি’ নামে পরিচিত। প্রায় ৬০ বছর ধরে এখানে বসবাসকারী সরস্বতী বিশ্বাস বলেন, ‘বহু বছর ধরে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের গরিব মানুষ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে একসঙ্গে থাকলেও এমন অসুবিধার মুখে আগে কখনও পড়িনি।’

বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই সঙ্কটের মূলে রয়েছে স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারির মুসলিম বিদ্বেষী মন্তব্য। ভোটে জেতার পর এক জনসভায় তিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন— মুসলমানরা তাঁকে ভোট দেননি, তাই আগামী পাঁচ বছর তিনি তাঁদের জন্য কোনও কাজ করবেন না। পাশাপাশি, নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর থেকেই এই ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর সুমন সিং এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন বলে দাবি বাসিন্দাদের। শুধুই জলকষ্ট নয়, স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের উচ্ছেদের হুমকিতেও দিন কাটছে বস্তিবাসীদের।

বর্তমানে বাধ্য হয়ে ৭০০ টাকা দিয়ে কেএমসি-র গাড়ির পানি কিনছেন গরিব মানুষগুলো। ‘পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতি’-র নেতা অজিত শাসমল বলেন, ‘তিন-চার দিনের ব্যবধানে মাত্র এক ট্যাঙ্ক জল এত মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। হিন্দু-মুসলিম রাজনীতি করে বিজেপি গরিব মানুষদের হয়রানি করছে।’ তিনি আরও জানান, সরকারি রেজিস্টার্ড কলোনিতে এভাবে জল বন্ধ রাখা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং গণতন্ত্রের লজ্জা। ইতিমধ্যেই প্রশাসনের নানা স্তরে ডেপুটেশন জমা দেওয়া হয়েছে এবং মানবাধিকার কমিশনকেও সমস্যার কথা জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ এক মাস কেটে গেলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। তবে বস্তি উচ্ছেদ রুখতে ইতিমধ্যেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে বস্তি উন্নয়ন সমিতি। আইনজীবী শামীম আহমেদ জানিয়েছেন, আদালত এই উচ্ছেদের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ দিয়েছে। ছাদটুকু বাঁচাতে আর তৃষ্ণার জলটুকু ফিরে পেতে এখন কেবল আইনি লড়াই আর প্রশাসনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন জ্যোতিনগরের অসহায় বাসিন্দারা।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
admin আপনার আশেপাশের তথ্য, সংবাদ, সমস্যা, সম্ভবনা, প্রতিভা, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, ব্যবসা, বানিজ্য প্রতিটি তথ্যের বিন্দু বিসর্গ তুলে ধরতে চাই। এই চেষ্টায় আপনাদের সাথে চাই, পাশে চাই, সহযোগীতা, পরামর্শ তথ্য চাই। md.sumon71khobor@gmail.com