আর্থিক স্থিতিশীলতা ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আদেশ
দেশের ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বিধান প্রযোজ্য করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসা ও কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনসাধারণের স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন ডিপার্টমেন্ট থেকে জারি করা বিআরডি আদেশে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
আদেশে বলা হয়েছে, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ধারা ৭১-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সব লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফাইন্যান্স কোম্পানিতে প্রযোজ্য:
বাংলাদেশ ব্যাংকের আদেশ অনুযায়ী, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর অধীনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব ফাইন্যান্স কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বিধান প্রযোজ্য হবে।
অর্থাৎ, শুধু তফসিলি ব্যাংক নয়, দেশের ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোও এখন ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের আওতাভুক্ত একটি কাঠামোর মধ্যে আসবে। এর ফলে কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানি আর্থিকভাবে সংকটে পড়লে সেটি মোকাবিলা ও প্রয়োজনীয় রেজল্যুশন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিধান প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং ফাইন্যান্স কোম্পানি কর্তৃক পরিচালিত ব্যবসা ও কার্যক্রম সম্পর্কিত জনসাধারণের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচনায় ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর অধীন লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব ফাইন্যান্স কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বিধান প্রযোজ্য হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত:
বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো ব্যাংকের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমানত গ্রহণ, ঋণ ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানি গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়লে তার প্রভাব শুধু প্রতিষ্ঠানের মালিক বা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আমানতকারী, ঋণগ্রহীতা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের ওপরও পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন আদেশের মূল লক্ষ্য হিসেবে তাই আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং জনস্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি সামনে এসেছে।
অস্থায়ী প্রশাসনের পথও খুলছে:
এর আগে ৬ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর অধীনে অস্থায়ী প্রশাসন সংক্রান্ত প্রবিধানমালা, ২০২৬’ জারি করে। ওই প্রবিধানমালায় সংকটাপন্ন ব্যাংক বা রেজল্যুশনের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ, প্রশাসকের ক্ষমতা ও দায়িত্ব, ফরেনসিক নিরীক্ষা, সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনা এবং পরবর্তী সময়ে নতুন ব্যবস্থাপনার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখন ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকেও ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের আওতায় আনার ফলে ওই রেজল্যুশন কাঠামো ফাইন্যান্স কোম্পানির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি হলো।
এর ফলে কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানি ভবিষ্যতে গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়লে পরিস্থিতি অনুযায়ী রেজল্যুশন কাঠামোর আওতায় এনে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জনস্বার্থ রক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
সংকট ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ল
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে আর্থিক খাতের সংকট ব্যবস্থাপনার কাঠামো সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতদিন ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির সংকট মোকাবিলায় পৃথক আইনি কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও নতুন আদেশের মাধ্যমে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিধান কার্যকর করার সুযোগ সৃষ্টি হলো।
ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের অধীনে সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অস্থায়ী প্রশাসন, সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনা, ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এবং ফরেনসিক নিরীক্ষাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে আইনের আওতায় আনার ফলে এসব রেজল্যুশন-ভিত্তিক ব্যবস্থার প্রয়োগের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হলো।
জনস্বার্থকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ গুরুত্ব
বাংলাদেশ ব্যাংকের আদেশে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা’ এবং ফাইন্যান্স কোম্পানির ব্যবসা ও কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘জনসাধারণের স্বার্থ সুরক্ষা’র প্রয়োজনীয় বিবেচনায়।
অর্থাৎ, কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানির সংকট দেখা দিলে শুধু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি বা পরিচালনাগত দুর্বলতার বিষয়টি বিবেচনা না করে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষের স্বার্থও রেজল্যুশন কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হবে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0
