হাম্মাদ মুজিবকে নিয়ে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

Sep 11, 2026 - 05:26
 0  1
হাম্মাদ মুজিবকে নিয়ে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক হাম্মাদ মুজিবের বিদেশে বিপুল সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সাইপ্রাসে নিজের নামে দুটি এবং ‘বাগুটেল লিমিটেড’ নামে আরও দুটি ব্যাংক হিসাব—সব মিলিয়ে চার ব্যাংক হিসাবে লাখ লাখ ইউরো ও মার্কিন ডলারের লেনদেনের তথ্য পেয়েছে দুদক। তদন্তে এসব অর্থের উৎস জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে উঠে এসেছে। শুধু সাইপ্রাসেই নয়, এসব হিসাব থেকে লন্ডনে বোন ও ছেলের কাছে বিপুল অর্থ পাঠানোর তথ্যও মিলেছে। এমনকি লন্ডনে সম্পত্তি কেনার জন্য ‘উপহার’ দেখিয়ে ২ লাখ ৩ হাজার ৯২৫ ইউরো পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশের সম্পদ সরিয়ে ফেলার আশঙ্কায় যুক্তরাজ্যে থাকা সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

এসব হিসাবে কয়েক লাখ ইউরো ও মার্কিন ডলারের লেনদেন হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ৩ সেপ্টেম্বর বিদেশে থাকা সম্পদ সরিয়ে ফেলা বা হস্তান্তরের আশঙ্কায় হাম্মাদ মুজিব এবং তার সংশ্লিষ্টদের যুক্তরাজ্যে থাকা অস্থাবর সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, সাইপ্রাসের একটি হিসাব থেকে যুক্তরাজ্যে তার বোন রাহি রহমানের কাছে ২ লাখ ৩ হাজার ইউরো পাঠানো হয়। ব্যাংক নথিতে অর্থগুলো ‘উপহার’ হিসাবে দেখানো হলেও দুদক বলছে, লন্ডনের একটি সম্পত্তি কেনার জন্য এ অর্থ পাঠানো হয়েছিল। একই হিসাব থেকে তার ছেলে রাগিব মুহাম্মদ আখিয়ারের পড়াশোনার খরচ বাবদ লন্ডনের একটি কলেজেও অর্থ পাঠানো হয়।

দুদক সূত্র জানায়, বিদেশে এসব ব্যাংক হিসাব ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য দুদকে দাখিল করা সম্পদবিবরণীতে উল্লেখ করেননি হাম্মাদ মুজিব। বিদেশে বিনিয়োগের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের কোনো নথিও তিনি দেখাতে পারেননি বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট মামলা করে দুদক।

মামলায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২) ধারার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদক বলছে, হাম্মাদ মুজিব ঘুস ও দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন করেছেন।

পরে ওই অর্থ হুন্ডি, অর্থ স্থানান্তর ও স্তরীকরণের মাধ্যমে দেশের বাইরে নেওয়া হয়েছে। সাইপ্রাসের ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অর্থের উৎস, অবস্থান, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ আড়াল করা হয়েছে বলেও জানায় দুদক।

দুদকের নথি অনুযায়ী, হাম্মাদ মুজিব ২০১২ সালের ২৯ অক্টোবর সাইপ্রাসের ব্যাংক অব সাইপ্রাসে নিজের নামে একটি হিসাব খোলেন। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ থেকে ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ওই হিসাবে জমা পড়ে ২ লাখ ৬০ হাজার ৬৮১ দশমিক ২৫ ইউরো। নিজের নামে খোলা আরেকটি হিসাবে লেনদেন হয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ২২৩ মার্কিন ডলার। এর বাইরে ‘বাগুটেল লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠানের নামে একই ব্যাংকে দুটি হিসাব খোলা হয়। এর একটিতে ২ লাখ ৫০ হাজার ৭৩৪ দশমিক ৭২ ইউরো এবং অন্যটিতে ২০ লাখ ৪৪ হাজার ২৮ দশমিক ২২ মার্কিন ডলার জমা ও উত্তোলনের তথ্য পেয়েছে দুদক। তদন্তে এসব অর্থের উৎস হাম্মাদ মুজিবের জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে বলছে দুদক।

দুদকের অনুসন্ধানের পর হাম্মাদ মুজিবকে সম্পদবিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়া হয়। তিনি ২০২০ সালের ২ জুন সম্পদবিবরণী জমা দেন। কিন্তু এতে সাইপ্রাসে নিজের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশে থাকা সম্পদের কোনো তথ্য উল্লেখ করেননি।

দুদকের অনুসন্ধানে বিদেশে অর্থ উপার্জনের বৈধ উৎস কিংবা বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদনের কোনো রেকর্ডও পাওয়া যায়নি। সরকারি কর্মচারী হিসাবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং ব্যাংক হিসাব খোলার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।

দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পদবিবরণীতে এসব তথ্য না দেওয়ার মাধ্যমে হাম্মাদ মুজিব সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন।

সাইপ্রাসের ব্যাংক হিসাবের তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি দুদকের সামনে আসে। ২০১৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর হাম্মাদ মুজিবের হিসাব থেকে লন্ডনের অ্যাশবোর্ন কলেজে তার ছেলে রাগিব মুহাম্মদ আখিয়ারের শিক্ষার খরচ বাবদ ২০ হাজার ৪৮৯ দশমিক ৯৭ ইউরো পাঠানো হয়। এরপর ২০১৯ সালের ২৯ মার্চ ৪৬ হাজার ৯৪৮ দশমিক ৩৫ ইউরো, ৮ এপ্রিল ৫০ হাজার ইউরো এবং ১৭ এপ্রিল ১ লাখ ৬ হাজার ৯৭৬ দশমিক ৭৩ ইউরো যুক্তরাজ্যে তার বোন রাহি রহমানের কাছে পাঠানো হয়। তিন দফায় পাঠানো অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৩ হাজার ৯২৫ দশমিক শূন্য ৮ ইউরো।

ব্যাংক নথিতে এসব অর্থকে ‘উপহার’ হিসাবে দেখানো হয়েছে। দুদক বলছে, লন্ডনের ৩৩০ ওয়েল হল রোডের একটি সম্পত্তি কেনার জন্য ওই অর্থ পাঠানো হয়েছিল। এ লেনদেনে ‘বোলিং অ্যান্ড কোম্পানি’ নামের একটি হিসাব ব্যবহার করা হয়।

এছাড়া তদন্তে হাম্মাদ মুজিবের সাইপ্রাসের হিসাব থেকে যুক্তরাজ্যে আরও ২ লাখ ৪৬ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯৩ ইউরো এবং ২ লাখ ৩৯ হাজার ৮৯০ দশমিক ৪১ মার্কিন ডলার পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

বিদেশে থাকা সম্পদ সরিয়ে ফেলা বা হস্তান্তরের আশঙ্কায় হাম্মাদ মুজিব ও তার সংশ্লিষ্টদের যুক্তরাজ্যে থাকা অস্থাবর সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন।

আদালতের আদেশে বলা হয়, নথিপত্র পর্যালোচনায় প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে হাম্মাদ মুজিব দেশে ও বিদেশে জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন এবং অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। সম্পদ গোপন, হস্তান্তর বা সরিয়ে ফেলা ঠেকাতে সেগুলো জব্দ করা প্রয়োজন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ১৪ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা ২০০৭-এর ১৮ বিধি অনুযায়ী আবেদনে উল্লিখিত যুক্তরাজ্যের অস্থাবর সম্পদ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জব্দ রাখার আদেশ দেওয়া হয়। মামলার তদন্তে হাম্মাদ মুজিবের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকার তথ্য কিংবা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অন্য কোনো সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনার কথা জানিয়েছে দুদক।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
admin আপনার আশেপাশের তথ্য, সংবাদ, সমস্যা, সম্ভবনা, প্রতিভা, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, ব্যবসা, বানিজ্য প্রতিটি তথ্যের বিন্দু বিসর্গ তুলে ধরতে চাই। এই চেষ্টায় আপনাদের সাথে চাই, পাশে চাই, সহযোগীতা, পরামর্শ তথ্য চাই। md.sumon71khobor@gmail.com