শুধু পৃথিবী নয়, চাঁদের আশপাশেও যুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র

Sep 17, 2026 - 05:21
 0  1
শুধু পৃথিবী নয়, চাঁদের আশপাশেও যুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র

মহাকাশে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি আরও জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে এবার চাঁদের আশপাশের এলাকাকেও ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানের আওতায় আনার সক্ষমতা তৈরির কথা জানিয়েছে দেশটির সামরিক নেতৃত্ব। এ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশনীতি ও সামরিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ওয়াশিংটনের বাইরে বুধবার আয়োজিত বিমান, মহাকাশ ও সাইবারবিষয়ক এক সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীকে এমনভাবে প্রস্তুত হতে হবে, যাতে সমুদ্রের তলদেশ থেকে শুরু করে চাঁদের কক্ষপথের আশপাশ পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় লড়াই করা, টিকে থাকা এবং প্রয়োজন হলে জয়ী হওয়ার সক্ষমতা থাকে। তাঁর মতে, যুদ্ধের জন্য একটি নতুন সীমান্ত তৈরি হচ্ছে এবং সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামরিক বাহিনীকে মানিয়ে নিতে হবে।

একই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের কমব্যাট ফোর্সেস কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল গ্রেগরি গ্যাগননও চাঁদের আশপাশের মহাকাশে সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রস্তুতির কথা জানান। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, স্পেস ফোর্স মহাকাশ ও চাঁদের আশপাশের এলাকায় অভিযান চালানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, মানবজাতি মহাকাশের আরও গভীরে প্রবেশ করছে এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রস্তুত থাকা স্পেস ফোর্সের দায়িত্ব।

এর কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা জানিয়েছিল। একই সম্মেলনে বিমানবাহিনীর মন্ত্রী ট্রয় মেইংক জানান, যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশে ‘কক্ষপথে থাকা মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র’ মোতায়েন করেছে। তবে অস্ত্রটির ধরন, অবস্থান কিংবা ব্যবহারের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। এর পরই গ্যাগননের বক্তব্যে চাঁদের আশপাশের এলাকাকে সম্ভাব্য সামরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র হিসেবে সামনে আনা হয়।

সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে চীনের কথাও উল্লেখ করেছেন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা। গ্যাগনন বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সম্ভাব্য প্রতিপক্ষরা ভবিষ্যতে যুদ্ধকে মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত করার চেষ্টা করতে পারে। তাঁর দাবি, চীনের মতো দেশগুলো মহাকাশব্যবস্থার বিভিন্ন অংশে সক্রিয়ভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে।

২০২৪ সালে চীন নিজস্ব সামরিক মহাকাশ বাহিনী গঠন করে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, মহাকাশসংক্রান্ত বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই বাহিনীটি গঠন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের ঘোষণা নিয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, চীন সব সময় মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পক্ষে। মহাকাশের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং এর অস্ত্রায়ন, সামরিকীকরণ ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিরোধিতা করে বেইজিং। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশে সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘোষণা ও সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েন কিংবা চাঁদের আশপাশে সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইনের সীমারেখার মধ্যে পড়ে কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই স্বাক্ষরকারী দেশ। ওই চুক্তি অনুযায়ী, চাঁদসহ মহাজাগতিক বস্তুগুলো শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করতে হবে। মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পাশাপাশি মহাকাশে পাঠানো কোনো বস্তু বা মহাকাশযানের কারণে ক্ষয়ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট দেশকে তার দায় নিতে হবে। তবে মহাকাশে সব ধরনের প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে চুক্তিতে একই ধরনের সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক সক্ষমতা ও পরিকল্পনা চুক্তির কোন সীমার মধ্যে পড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস করার সক্ষমতার পরীক্ষা চালিয়েছে। এসব পরীক্ষা পৃথিবী থেকে পরিচালিত হয়েছে এবং সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এবার মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে চাঁদের আশপাশের মহাকাশও সম্ভাব্য সামরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এসেছে। এতে মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। দুই বছর আগে জাতিসংঘেও মহাকাশের সামরিকীকরণ প্রতিরোধে ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর আগে বিভিন্ন মার্কিন প্রতিবেদনে রাশিয়ার মহাকাশভিত্তিক একটি অস্ত্র তৈরির বিষয়টি উঠে আসে। মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি এবং মোতায়েন না করার আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান জাতিসংঘে একটি যৌথ প্রস্তাবও দিয়েছিল। ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তিতে এ ধরনের অস্ত্র নিষিদ্ধ রয়েছে।

তবে ওই প্রস্তাবে রাশিয়া ভেটো দেয়। পরে মস্কোর পক্ষ থেকেও একটি পাল্টা প্রস্তাব আনা হয়, যেখানে মহাকাশে সব ধরনের অস্ত্র ‘চিরকালের জন্য’ নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই প্রস্তাবও পাস হয়নি।

এদিকে মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্পেস ফোর্সের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গ্যাগনন জানান, আগামী পাঁচ বছরে স্পেস ফোর্সের সদস্যসংখ্যা দ্বিগুণ করে প্রায় ২৫ হাজারে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। বাড়তি সদস্যদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ স্পেস ফোর্সের কমব্যাট ফোর্সেস কমান্ডে যুক্ত করা হবে।

গ্যাগননের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীতে বিভিন্ন ধরনের নতুন সক্ষমতা তৈরি করছে। এর লক্ষ্য দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তুত থাকা এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করার মতো সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলা।

তবে মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চুক্তির সীমারেখা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে গ্যাগনন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স মহাকাশের সব এলাকায় নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে অভিযান পরিচালনা করবে। তবে মহাকাশে গুলি, ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে স্পেস ফোর্সের নির্দিষ্ট নীতি কী, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি তিনি। এ বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন গ্যাগনন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
admin আপনার আশেপাশের তথ্য, সংবাদ, সমস্যা, সম্ভবনা, প্রতিভা, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, ব্যবসা, বানিজ্য প্রতিটি তথ্যের বিন্দু বিসর্গ তুলে ধরতে চাই। এই চেষ্টায় আপনাদের সাথে চাই, পাশে চাই, সহযোগীতা, পরামর্শ তথ্য চাই। md.sumon71khobor@gmail.com