বিশ্বকাপ হবে কার–স্পেন নাকি আর্জেন্টিনার, রাতে ফয়সালা

Jul 19, 2026 - 02:37
 0  1
বিশ্বকাপ হবে কার–স্পেন নাকি আর্জেন্টিনার, রাতে ফয়সালা

মাত্র ৯০ মিনিট। সময়টা হয়তোবা হতে পারে ১২০ মিনিট। এমনকি টাইব্রেকারও। এরপরই ঠিক হয়ে যাবে সামনের চার বছরের জন্য পৃথিবীর সেরা ফুটবল দল কোনটি। যাদের নাম উচ্চারণের আগে আপনাকে বলতে হবে—বিশ্বচ্যাম্পিয়ন!

বিশ্বকাপ ফাইনালের চেয়ে বড় মঞ্চ ফুটবলে আর কিছু নেই, সেই মঞ্চেই আজ নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে দুই ভিন্ন দর্শনের দুই পরাশক্তি—লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা এবং লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন। বিশ্বকাপের পেছনের সাত ম্যাচে যে মান, মেজাজ ও আকর্ষণীয় ফুটবল খেলেছে এই দুটি দল তাতে যথাযোগ্য দল হিসেবেই আজকের ফাইনালে খেলছে তারা।

তবে আজ রাতের এই ফাইনাল শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়। এটি ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের, আবেগের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণের, হার না মানার জেদি একটি দলের সঙ্গে সুন্দর সিস্টেম মেনে চলা দলের ফুটবল লড়াই। একদিকে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপের সম্ভাব্য শেষ রাত, অন্যদিকে লামিনে ইয়ামালের শুরু হতে যাওয়া এক নতুন যুগ। আজ রাতের ফাইনাল তাই কেবল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করবে না, হয়তো বা ফুটবলের ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও ঠিক করে দেবে।

আরো একটি অদ্ভুত প্রেক্ষাপট এই ম্যাচকে ঘিরে। দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের চ্যাম্পিয়নদের মধ্যকার ফিনালিসিমা ফুটবল লড়াইটা এ বছর হয়নি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ডামাডোলে। তাই দুই মহাদেশের সেরা দল প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হচ্ছে সরাসরি বিশ্বকাপের সিংহাসনের লড়াইয়ে। এই স্বীকৃতি অর্জনের জন্য বিশ্বকাপ ফুটবলের চেয়ে বড় মঞ্চ আর কী হতে পারে?

কাতার বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা—এরপর আরেকটি বিশ্বকাপ। জিততে পারলে টানা চারটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতা প্রথম দেশ হবে আর্জেন্টিনা। একই সঙ্গে ইতালি ও ব্রাজিলের পর টানা দুটি বিশ্বকাপ জেতা মাত্র তৃতীয় দেশ হবে তারা। হিসাবটা খুব সহজ মনে হচ্ছে, তাই না? কিন্তু আর্জেন্টিনার এই সম্ভাবনা এবং সাফল্যের পথে ক্রসচিহ্ন এঁকে আজকের রাতটা কেবল নিজেদের করার শপথও যে নিয়েছে স্পেন। লড়াই জমবে বেশ!

চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জয়, মিসরের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচ জিতে ফেরা, আর সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে আরেকটি অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্পগাঁথা—প্রতিটি ধাপ যেন তাদের আরো কঠিন, আরো অভিজ্ঞ করে তুলেছে। এই দলটির স্লোগান একটাই—নেভার সে ডাই!

এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ১৯ গোল করেছে, যা তাদের ইতিহাসে এক আসরে সর্বোচ্চ। প্রতিটি ম্যাচে অন্তত দুই গোল করার কীর্তিও বলছে, এই দল কখনো হাল ছাড়ে না। কিন্তু একই সঙ্গে রক্ষণে দুর্বলতাও স্পষ্ট। টানা পাঁচ ম্যাচে ক্লিন শিট নেই। আক্রমণে বিস্ফোরণ আর রক্ষণে ভাঙন—দুটোই আজ তাদের সঙ্গী। গোল হজম করার পর যে গোটা ম্যাচে আরো বেশি তেতে ওঠে আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করার তাদের আক্রমণের পশলা যেন শুরু হয় ম্যাচের শেষ ১৫-২০ মিনিটে। পিছিয়ে থাকা পুরো দল তখন যেন রক্তের ঘ্রাণ পাওয়া নেকঁড়ে বাঘ! আর এই সময়ে বল পায়ে মেসি যা করেন তার নাম, শিল্প। তার নাম গোল! জয়ে ফেরা।

আর্জেন্টিনা যেখানে আবেগে ম্যাচ জেতে, স্পেন সেখানে ম্যাচকে নিয়ন্ত্রণ করে। কোচ দে লা ফুয়েন্তের দল প্রতিপক্ষকে খেলতে দেয় ঠিকই, কিন্তু খেলতে দেয় না নিজের মতো করে। ২০২৪ সালের মার্চের পর থেকে টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত স্পেন। এই বিশ্বকাপে ছয়টি ক্লিন শিট, মাত্র একটি গোল হজম, গড়ে ৬৪ শতাংশ বল দখল—এসব পরিসংখ্যানের সংখ্যাই বলে দেয় কেন তারা এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে পরিপূর্ণ দল। যাকে বলে কমপ্যাক্ট টিম।

রদ্রিকে ঘিরে গড়ে ওঠা ডায়মন্ড মিডফিল্ড, পেদ্রি-ফ্যাবিয়ান-ওলমোর অবিরাম অবস্থান বদল, ডিফেন্স সামলেও কুবার্সি ও লাপোর্তের সাহসী বিল্ডআপ, ফুলব্যাকদের ভেতরে ঢুকে মিডফিল্ড তৈরি করা—স্পেনের ফুটবল যেন দাবার বোর্ডে সাজানো এক নিখুঁত কৌশল। আর গোলকিপার সিমন যেন দলের বাড়তি একজন সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলছেন!

সেমিফাইনালে ফ্রান্সের মতো দুর্ধর্ষ আক্রমণভাগকে আটকে দিয়ে স্পেন জানিয়ে দিয়েছে তাদের এই রক্ষণভাগ ভাঙা খালি পায়ে এভারেস্ট টপকানোর মতোই কঠিন।

স্পেন বনাম আর্জেন্টিনার আজকের ফাইনালে আরেকটি লড়াই চলছে। যার ট্যাগলাইন হলো, এক প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের, এক সাম্রাজ্যের সঙ্গে আরেক সম্ভাব্য সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হওয়ার লড়াই। এক পাশে লিওনেল মেসি—দুই দশক ধরে বিশ্বফুটবলের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া এক কিংবদন্তি। অন্য পাশে লামিনে ইয়ামাল—যার পায়ে অনেকেই দেখতে শুরু করেছেন আগামী দশকের ফুটবলকে।

দুই ফুটবলারের দূরত্বটা শুধু বয়সের নয়, অভিজ্ঞতারও।

মেসির এটি টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা দলে থাকা ২৬ ফুটবলারের মধ্যে ১৭ জনই এর আগে বিশ্বকাপ খেলেছেন। বড় মঞ্চের চাপ, নকআউটের উত্তেজনা কিংবা ফাইনালের ভার—এসব তাদের কাছে নতুন নয়। আর মেসির জন্য তো এটি বিশ্বকাপ ফাইনালের তৃতীয় অধ্যায়। ২০১৪ সালে ফাইনালে হারের বেদনায় মারাকানায় কেঁদেছিলেন তিনি। ২০২২ সালে কাতারে একই স্বপ্ন পূরণ করে আনন্দাশ্রুতে ভেসেছিলেন। এবার নিউ জার্সিতে তার জন্য অপেক্ষা করছে কোনো সমাপ্তি—আরো এক মহিমা, নাকি আরেকটি অপূর্ণতার গল্প—উত্তর মিলবে আজ রাতেই।

স্পেনের গল্পটি ঠিক যেন একই। এই স্কোয়াডের রদ্রি ও সিমনসহ ১১ জন ফুটবলারের রয়েছে বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা। তবে বিশ্বকাপের ফাইনালের চাপ তারা আগে কখনো অনুভব করেনি। তবে বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা একেবারেই নেই, এমন নয়। এই দলই ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, ইউরোপের সর্বোচ্চ মঞ্চে জয়ের স্বাদ পেয়েছে। বিশ্বকাপের ফাইনালে তারা নবীন, তবে জয়ের মানসিকতায় বিন্দুমাত্র পিছিয়ে নয়।

এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে লামিন ইয়ামাল। যে সময় মেসি জার্মানিতে ২০০৬ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে নেমেছিলেন, তখন স্পেনের বিস্ময়বালক ইয়ামালের জন্মও হয়নি। পরে সেই মেসির কোলে বসা, তাকে দিয়ে গোসল করানোর ছবিই আজ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতীকী আলোকচিত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। ভাগ্যের চিত্রনাট্যকারও বোধহয় এর চেয়ে সুন্দর গল্প লিখতে পারতেন না।

তবে এই দ্বৈরথ শুধু আবেগের নয়, কৌশলেরও।

মেসি ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। হাঁটেন, দৌড়ান, অপেক্ষা করেন, প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করেন, তারপর মুহূর্তেই একটা ডিফেন্স চেরা পাস অথবা গোলে খেলার রং বদলে দেন। আর ইয়ামাল ঠিক তার বিপরীত—গতিতে, ড্রিবলে, হঠাৎ বিস্ফোরণে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স কাঠামো ভেঙে দেন। একজন সময়কে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন, আরেকজন সময়ের গতি বাড়িয়ে দেন।

আজকের ফাইনালে দেখা যাবে ফুটবলের দুটি সময়কে—একটি যুগ বিদায় নিতে চায় আরো একবার বিশ্বজয়ের মুকুট পরে, আরেকটি যুগ শুরু করতে চায় নিজের প্রথম বিশ্বমুকুট জিতে। কার ইচ্ছা পূরণ হবে?

ফুটবল এমন গল্প খুব কমই লেখে। কিন্তু যখন লেখে, তখন সেটিই ইতিহাস হয়ে যায়।

নতুন কিছু নয়, সম্ভবত পুরোনো ফর্মুলায় ফাইনালের পরিকল্পনা সাজাচ্ছে স্পেন। তারা ভালোই জানে, মাঝমাঠ দখল তো ম্যাচ মুঠোয়। আজ সেই মাঝমাঠ তারা চাইবে রদ্রির মাধ্যমে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে, মেসিকে ম্যাচ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে এবং আর্জেন্টিনার রক্ষণকে ধৈর্যের পরীক্ষায় ফেলতে।

অন্যদিকে স্কালোনির সবচেয়ে বড় আশা থাকবে সেট পিস এবং দ্রুত ট্রানজিশনে ফেরা। এই বিশ্বকাপে সাতটি সেট পিস গোল করা আর্জেন্টিনা জানে, স্পেনের মতো সংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে কখনো কখনো একটা নিখুঁত কর্নারই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মাঝমাঠে আজ বড় লড়াই হবে রদ্রি বনাম এনজো ফার্নান্দেজ। মেসি-ইয়ামালের মতো এই দুজনের দ্বৈরথও নির্ধারণ করতে পারে ম্যাচের গতি।

বিশ্বকাপ ফাইনাল কখনো শুধু পরিসংখ্যান মেনে চলে না। এখানে সাহস জেতে। চরিত্র জেতে। কখনো কখনো কোনো একজনের ফুটবল জাদুর ঝলকও ট্রফি জেতায়। এই ফাইনালের সেই একক নায়ক কে হবেন?

স্পেন এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সংগঠিত, সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সবচেয়ে আবেগী, সবচেয়ে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের দল। এক পক্ষ বিশ্বাস করে সিস্টেম, কাঠামোয় এবং টিম গেমে। অন্য পক্ষ বিশ্বাস করে কখনো বিশ্বাস না হারানোয়। শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়াইয়ের তেজে। জেতার জেদে জীবন পর্যন্ত বাজি লাগায় তারা।

তাহলে আজ রাতে কি ইতিহাস নতুন এক সম্রাট পাবে? নাকি পুরোনো সম্রাট নিজের মুকুট আরো একবার চকচকে করে তুলবেন?

মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আজ ফয়সালা হবে—ফুটবলের সিংহাসনে আগামী চার বছর রাজত্ব হবে কার? আর সেই গল্পের নায়ক হবেন কে?

সেই আনন্দ উপভোগ করতে বিশ্বকাপ ফাইনালে আপনাকে আমন্ত্রণ। ম্যাচ শুরু ঠিক রাত ১টায়।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
admin আপনার আশেপাশের তথ্য, সংবাদ, সমস্যা, সম্ভবনা, প্রতিভা, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, ব্যবসা, বানিজ্য প্রতিটি তথ্যের বিন্দু বিসর্গ তুলে ধরতে চাই। এই চেষ্টায় আপনাদের সাথে চাই, পাশে চাই, সহযোগীতা, পরামর্শ তথ্য চাই। md.sumon71khobor@gmail.com