গণপরিবহনে ফিরবে শৃঙ্খলা

Jul 23, 2026 - 00:47
 0  1
গণপরিবহনে ফিরবে শৃঙ্খলা

ঢাকার বাস টার্মিনাল মহানগর থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু, টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে চলে গেলে দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা রাজধানীর চিরচেনা দৃশ্য যানজট সমস্যা কমে আসবে * সায়েদাবাদ টার্মিনাল কাঁচপুরে, মহাখালী টার্মিনাল টঙ্গী এবং গাবতলী টার্মিনাল হেমায়েতপুর এলাকায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

রাজধানী ঢাকার ভেতরে বাস টার্মিনাল থাকার কারণে শহরের অভ্যন্তরে তীব্র যানজট ভোগান্তি নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। বছরের পর বছর ধরে এসব বাস টার্মিনালের কারণে যানজটসহ নানা ভোগান্তি পোহাতে হলেও বিগত সরকারের আমলে নগরবাসীর এসব সমস্যা সমাধানে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এসব বাস টার্মিনালকে পুঁজি করে চাঁদাবাজিসহ নানান সুবিধা নিয়েছেন তৎকালীন সরকারি দলের লোকজন। তবে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় সরছে ঢাকার ভেতর থেকে বাস টার্মিনাল। সায়েদাবাদ টার্মিনাল কাঁচপুরে, মহাখালী টার্মিনাল টঙ্গী এলাকায় এবং গাবতলী টার্মিনাল আমিনবাজার-হেমায়েতপুর এলাকায় স্থানান্তর করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর ভেতরে গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আসবে, নাগরিকদের চলাচলে যানজট কমে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. হাদিউজ্জামান ইনকিলাবকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ঢাকা শহরের টার্মিনালকেন্দ্রিক যানজট কমাতে বাস টার্মিনালের বাসগুলোর ডিপোর জন্য শহরের বাইরে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাসগুলো শুধু যাত্রী নেয়ার সময় টার্মিনালে আসবে। একইভাবে মহাখালী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়াসহ বাস টার্মিনালের জন্যও বিকল্প স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ব্যবস্থাপনাটির সঠিক বাস্তবায়ন হলে ঢাকা শহরের যানজট ও পরিবহন ব্যবস্থায় অনেকাংশে শৃঙ্খলায় আসবে বলে মনে করি

Maps

ঢাকার বিভিন্ন বাস টার্মিনালে প্রতিদিনই ভোগান্তির লক্ষ্য করা যায়। বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত যাত্রী চাপ, টিকিট পেতে হয়রানি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, যানজট, দালালের দৌরাত্ম্য এবং পর্যাপ্ত যাত্রীসেবার অভাবসহ নানা দুর্ভোগ সাধারণ যাত্রীদের বিষিয়ে তোল। প্রধান প্রধান বাস টার্মিনালগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। অনেকেই শ্রমজীবী, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য তারা বাসে ওঠার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, দাঁড়িয়ে থাকা এবং নানা অনিয়মের সঙ্গে লড়াই করেন। একইভাবে যাত্রীরা ওঠানামা, বাসের অপেক্ষা, গ্যারেজে যাতায়াত এবং টার্মিনাল ঘিরে ছোট যানবাহনের জটলা তৈরি হওয়ায় আশপাশের এলাকায় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয় বলছেন তারা।

দীর্ঘদিনের এই যানজট কমাতে এবার সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। নগরীর ভেতরে থাকা চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ধাপে ধাপে রাজধানীর বাইরে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী বাস কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে নয়াবাজার, তাতীবাজার ও গুলিস্তান এলাকায় বহুদিনের যানজট কমতে শুরু করেছে। এখন সায়েদাবাদ টার্মিনাল কাঁচপুরে, মহাখালী টার্মিনাল টঙ্গী এলাকায় এবং গাবতলী টার্মিনাল আমিনবাজার-হেমায়েতপুর এলাকায় স্থানান্তরের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।.

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি জানিয়েছেন, রাজধানীতে তীব্র যানজট কমানো এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক ও কার্যকর করতে ঢাকার চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের সরকারের উদ্যোগে নতুন গতি এসেছে। সরকার ও মালিক-শ্রমিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় কাক্সিক্ষত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। মহাখালী টার্মিনালে পড়ে থাকা বাসগুলোকে সরিয়ে পূর্বাচলে নেয়া হচ্ছে। ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনালটি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরিত হবে। সেখানে বড় জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। গাবতলী বাস টার্মিনালটি হেমায়েতপুরে নেয়া সিদ্ধান্ত হলেও আপাতত টার্মিনালের পাশে কৃষি মন্ত্রণালয়ে একটি খালি জায়গা রয়েছে। সেখানে সম্প্রসারিত করা হবে। সায়েদাবাদ টার্মিনালটি কাঁচপুরে নেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আন্তঃজেলা বাস রাজধানীর বাইরে থেকেই যাত্রী উঠানো-নামানোর কার্যক্রম পরিচালনা করবে। আর বর্তমানে নগরীর ভেতরে থাকা টার্মিনালগুলোকে ধীরে ধীরে সিটি টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সেখানে মূলত নগর পরিবহনের বাস চলাচল করবে। এতে দূরপাল্লার বাসের অযথা নগরীতে প্রবেশ কমবে, যানজট হ্রাস পাবে এবং যাত্রীসেবাও আরও সুশৃঙ্খল হবে। সম্প্রতি রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সরকার দ্রুত চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল রাজধানীর বাইরে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশনা দেয়। একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বাস কাউন্টারও নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাজধানীর ভেতরে আন্তঃজেলা বাসের অবাধ প্রবেশই যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

জানা যায়, রাজধানীর গাবতলী, সায়দাবাদ, মহাখালির মত বাস র্টার্মিনাল এখন পরিণত হয়েছে বাস ডিপোতে। শ্রমিকরা এ টার্মিনালেই থাকা, খাওয়া, ঘুমানোর কাজও করেন। পুরো টার্মিনাল এখনই ঢাকার বাইরে সরালে নাগরিক দুর্ভোগ বাড়বে। বর্তমান সময়ে পুরো টার্মিনাল সরিয়ে নিলে ঢাকায় যানজট আরো বাড়বে। মহাখালীতে নামে বাস টার্মিনাল হলেও এটি মূলত বাস ডিপোই হয়ে আছে। সারা দেশ থেকে আসা বাসগুলো এখানেই বিরতি নেয়। বাসের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, রং করার মত কাজগুলোও করা হয় টার্মিনালে। বাসের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করানোয় টার্মিনালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। যাত্রী ওঠানামা টার্মিনালের ভেতরে না হয়ে চলে যায় ব্যস্ততম সড়কে। শুধু বাসের বাইরের কাজই নয়। দেখা যায় এ টার্মিনালে বাসের ইঞ্জিন পরিবর্তনের কাজও করেন বাস মালিকেরা। বাস মেরামতের পর বাতিল যন্ত্রপাতির ভাগাড়ে পরিণত হয় টার্মিনালগুলো। এ কারণে বাইরের সড়ক দখল করে রাখেন বাস মালিকরা।

বর্তমানে মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল কার্যত বাস ডিপো ও ওয়ার্কশপে পরিণত হয়েছে। বহু বাস দিনের পর দিন সেখানে মেরামত বা পার্কিং অবস্থায় থাকে। এতে মূল্যবান নগর জায়গা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সড়কেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) মাস্টারপ্ল্যানেও রাজধানীর চারপাশে আধুনিক আন্তঃজেলা টার্মিনাল নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিন সেই পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সরকারি সিদ্ধান্তের ফলে এ প্রক্রিয়ায় গতি পেয়েছে।

ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যততত্র ছড়িয়ে থাকা বাস কাউন্টারগুলো দ্রুত সরিয়ে নির্দিষ্টস্থানে নেয়ার তাগাদা দিয়েছেন। রাজধানীর চারটি বাস টার্মিনাল অতিদ্রুত স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১৫ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জনপ্রশাসন কক্ষে রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন সংক্রান্ত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আন্তঃনগর বাস টার্মিনালগুলো হচ্ছে ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল, গাবতলী বাস টার্মিনাল, মহাখালী বাস টার্মিনাল এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ি বাস টার্মিনাল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনালটি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর হবে। মহাখালী বাস টার্মিনাল অস্থায়ীভাবে যাবে পূর্বাঞ্চলে এবং পরে স্থায়ীভাবে টঙ্গীর কাছে স্থানান্তরিত হবে। এছাড়া গাবতলী আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল হেমায়েতপুর এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ি বাস টার্মিনাল যাবে কাঁচপুরে।

পরিবহন মালিকরা বলছেন, বর্তমানে একটি আন্তঃজেলা বাস শহরের বাইরের অংশ থেকে কেন্দ্রীয় টার্মিনালে পৌঁছাতে অনেক সময় এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে। একই পথে ফিরতেও একই সময় লাগে। এই অতিরিক্ত যাত্রার কারণে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যানজট আরও তীব্র হয় এবং পরিবহন কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বাড়ে। শুধু টার্মিনাল সরিয়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে বাস রুট পুনর্বিন্যাস, টার্মিনালের অবকাঠামোগত সুবিধা, টিকিটিং, নির্ধারিত সময়সূচি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণসহ নানা সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি। গ্যারেজ, মেরামত কেন্দ্র এবং চালক-কর্মচারীদের বিশ্রামের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

তেজগাঁও এলাকার বাসিন্দা কাওসার আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ঢাকার বাস টার্মিনালগুলো স্থানান্তর হচ্ছে। তার এই নির্দেশনায় দীর্ঘদিনের এই সমস্যাটির সমাধান হলে শহরের ভেতরে যানজট অনেকটাই কমে আসবে। আমার কর্মস্থলে যেতে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়। বিশেষ করে বাস টার্মিনালের আশপাশে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ থাকে। মহাখালীর টার্মিনালের ভেতরে ও বাইরের রাস্তায় দিনের পর দিন বাস দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। টার্মিনাল শহরের বাইরে চলে গেলে যাতায়াত অনেক সহজ হবে এবং মানুষের ভোগান্তি কমে আসবে বলে মনে করি।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
admin আপনার আশেপাশের তথ্য, সংবাদ, সমস্যা, সম্ভবনা, প্রতিভা, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, ব্যবসা, বানিজ্য প্রতিটি তথ্যের বিন্দু বিসর্গ তুলে ধরতে চাই। এই চেষ্টায় আপনাদের সাথে চাই, পাশে চাই, সহযোগীতা, পরামর্শ তথ্য চাই। md.sumon71khobor@gmail.com